গত ১৫ বছরে আওয়ামী লীগ সরকারের সাফল্য নিয়ে যারা বলে কোনো কিছুই হয়নি, তারা আসলে বাস্তবতা থেকে অনেক দূরে। বাস্তবতা হলো, আওয়ামী লীগ ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন সংস্থা মিলে এক নির্দিষ্ট ন্যারেটিভ নির্মাণে সফল হয়েছে। এই ন্যারেটিভ দাঁড়ি-টুপি পরা মানুষদের শুধু মুসলমান হিসেবে দেখায় না, বরং প্রথমেই তাদের জামাত-শিবির বা রাজাকার হিসেবে চিহ্নিত করার দিকে এগিয়ে যায়। এটি একটি সুক্ষ্ম রাজনৈতিক কৌশলের অংশ, যা আওয়ামী লীগের মূল রাজনৈতিক এজেন্ডাকে আরও শক্তিশালী করেছে।
এই ন্যারেটিভের আরও বিস্তৃত রূপ হলো বিএনপি, জামাত-শিবির, যুদ্ধাপরাধী এবং রাজাকারকে এক সারিতে দাঁড় করানো। রাষ্ট্রের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মকে এমনভাবে প্রভাবিত করা হয়েছে, যেখানে দাঁড়ি-টুপি পরা যেকোনও মানুষকেই সন্দেহের চোখে দেখা হয়। ফলে সমাজে একটি ভুল ধারণার ভিত্তি গড়ে উঠেছে।
মিথ্যা ন্যারেটিভের প্রভাব
এখানে সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, কিছু প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীও এই বিভ্রান্তিকর ন্যারেটিভকে সমর্থন করে। এরা নিজেরাই ইসলামের মৌলিক চেতনায় বিশ্বাসী না হলেও, নিজেদের মুসলমান হিসেবে পরিচিত করে তুলছে। একই সাথে তারা ইসলামবিরোধী যেকোনো অবস্থানকে যুক্তিসঙ্গত হিসেবে প্রচার করে। এইসব লোকজন নিজেদেরকে এতটাই অসাম্প্রদায়িক হিসেবে উপস্থাপন করতে চায় যে, তারা হিন্দুদের মাথায় তুলে রাখছে, যেন তাদের চেয়ে কেউই বেশি হিন্দুপ্রেমী নয়।
এই ধরনের ভণ্ডামির স্পষ্ট প্রকাশ দেখা যায় সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতে। চট্টগ্রামের পূজামণ্ডপে দাঁড়ি-টুপি পরা কিছু তরুণ ইসলামি গান গাইলে সামাজিক মাধ্যমগুলোতে তাদের সমালোচনা শুরু হয়। তাদের এই কাজটি অবশ্যই সংবেদনশীল ছিল না, কিন্তু তা কোনোভাবেই অপরাধ নয়, যাতে তাদের গ্রেফতার করতে হয়। অথচ তাদের প্রতি কঠোর শাস্তির দাবি তোলা হয়েছে।
দ্বৈতনীতি ও সমাজের বিভাজন
এর বিপরীতে, ঝিনাইদহের জামায়াতের এমপি প্রার্থী প্রফেসর মতিয়ার রহমান পূজামণ্ডপে গিয়ে হিন্দু মন্ত্র জপছেন, এবং তাকে উলুধ্বনি দিয়ে স্বাগত জানানো হচ্ছে। তাকে কেউ প্রশ্ন করছে না, বরং প্রশংসা করা হচ্ছে। অথচ চট্টগ্রামের তরুণ শিল্পীরা সামান্য ইসলামি গান গাইলেই তারা শাস্তির মুখোমুখি হচ্ছে। এই দ্বৈতনীতি কি সমাজকে সুস্থ পথে নিয়ে যাবে?
এই ধরনের দ্বৈতনীতি আমাদের সমাজে আরও বিভাজন তৈরি করছে। একদিকে, পূজামণ্ডপে ইসলামি গান গাওয়ার জন্য গ্রেফতার করা হয়, আরেকদিকে মন্ত্র জপলে প্রশংসা পাওয়া যায়। ফলে আমাদের সমাজে এমন এক বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে, যেখানে ধর্মীয় চেতনা নিয়ে দ্বৈত মানসিকতা কাজ করছে।
মধ্যবিত্তের ভূমিকা
বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণি, যারা ফ্যাসিবাদ ও ভোটচুরির বিরুদ্ধে সবসময় সরব, তাদের মধ্যেও এই দ্বৈতনীতির প্রভাব স্পষ্ট। তারা সাকিব আল হাসানের 'সরি' বলার পর তাকে ক্ষমা করতে প্রস্তুত, কিন্তু পূজামণ্ডপে ইসলামি গান গাওয়া তরুণদের জন্য তারা কোনও ক্ষমার সুযোগ রাখতে রাজি নয়। তাদের দাবি, এই তরুণদের শাস্তি দেওয়া ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। অথচ সমাজের এই অংশটাই নিজেদেরকে অসাম্প্রদায়িক এবং উদারপন্থী হিসেবে দাবি করে।
সময় এসেছে ন্যারেটিভ চ্যালেঞ্জ করার
এই বিভ্রান্তিকর ন্যারেটিভকে চ্যালেঞ্জ করা ছাড়া আমাদের সামনে কোনো বিকল্প নেই। আমাদের সত্যিকারের অসাম্প্রদায়িক চেতনা গড়ে তুলতে হবে, যেখানে প্রত্যেক মানুষ তার ধর্মীয় এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়ে গর্ববোধ করবে এবং অন্যের ধর্মকে সম্মান দেখাবে। এমন এক সমাজ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে দ্বৈতনীতি বা ধর্মীয় বিভেদ কোনো স্থান পাবে না।
আমাদের উচিত একটি সহনশীল ও মর্যাদাপূর্ণ সমাজ গঠন করা, যেখানে মানুষ ধর্ম, সংস্কৃতি এবং মতের পার্থক্য সত্ত্বেও একে অপরকে শ্রদ্ধা করবে। এভাবে চলতে থাকলে, হয়তো একদিন ১৭ কোটি মুসলমান ১ কোটি হিন্দুকে সামাজিকভাবে বয়কট করবে, যা এই দেশের জন্য এক গভীর সংকট সৃষ্টি করবে।