অবঙালি পাহাড়িরা আদিবাসী নয়। তারা নিকট অতীতে মাইগ্রেট হওয়া সেটেলার কিংবা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী।
আদিবাসী কারা?
নৃতাত্ত্বিক সংজ্ঞায় আদিবাসী বা ‘এবোরিজিন্যালস’রা হচ্ছে, কোনো অঞ্চলের আদি ও অকৃত্রিম ভূমিপুত্র বা Son of the soil।’ প্রখ্যাত নৃতত্ত্ববিদ মর্গানের সংজ্ঞানুযায়ী আদিবাসী হচ্ছে ‘কোনো স্থানে স্মরণাতীতকাল থেকে বসবাসকারী আদিমতম জনগোষ্ঠী যাদের উৎপত্তি, ছড়িয়ে পড়া এবং বসতি স্থাপন সম্পর্কে বিশেষ কোনো ইতিহাস জানা নেই।’ মর্গান বলেন, The Aboriginals are the groups of human race who have been residing in a place from time immemorial … they are the true Sons of the soil…’ (Morgan, An Introduction to Anthropology, 1972).
উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, খর্বাকৃতির স্ফীত চ্যাপ্টা নাক কুঁকড়ানো কেশবিশিষ্ট কৃষ্ণবর্ণের ‘বুমেরাংম্যান’রা অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসী বা যথার্থ এবোরিজিন্যালস। তারা ওখানকার ভূমিপুত্রও বটে। ঠিক একইভাবে মাউরি নামের সংখ্যালঘু পশ্চাৎপদ প্রকৃতিপূজারী নিউজিল্যান্ডের ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী সেখানকার আদিবাসী। আমেরিকার বিভিন্ন নামের মঙ্গোলীয় ধারার প্রাচীন জনগোষ্ঠী যাদেরকে ভুলক্রমে ‘রেড ইন্ডিয়ান’ (উত্তর আমেরিকা) বলা হয় এবং সেন্ট্রাল আমেরিকা ও দক্ষিণ আমেরিকায় ইনকা, আজটেক, মায়ান, আমাজানসহ আরো অসংখ্য ক্ষুদ্র বিল্প্তু কিংবা সঙ্কটাপন্ন (Extinct or Endangered Groups) জনগোষ্ঠীকে সঠিক ‘এবোরিজিন্যালস’ বলে চিহ্নিত করা যায়।
**** বাংলাদেশের আদিবাসী, বা পাহাড়ের আদবাসী কারা?
বাংলাদেশের আদিবাসী হলো বাঙালি ও বাংলা ভাষাভাষীরা। কারণ তারাই প্রোটো-অস্ট্রোলয়েড (proto Astroloid) নামের আদি জনধারার অংশ বাংলাদেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর তারাই একমাত্র আদিবাসী এবং Son of the Soil বলে দাবি করতে পারে।
এর পেছনে অনেক জাতিতাত্ত্বিক, নৃতাত্ত্বিক ও বৈজ্ঞানিক যুক্তি-প্রমাণও রয়েছে। প্রোটো-অস্ট্রোলয়েড ধারার বাঙালি নামের বাংলাদেশের এই আদিবাসীরা যদিও একটি মিশ্র বা শংকর জনগোষ্ঠী হিসেবে পরিচিত সেখানে ককেশীয়, মঙ্গোলীয়, অস্ট্রিক জাতিধারার সাথে ভেড্ডাইট, নিগ্রোয়েড, দ্রাবিড়ীয় এবং অন্যান্য বহু জানা-অজানা আদি জনধারার সংমিশ্রণ ও নৃতাত্ত্বিক মিথষ্ক্রিয়া সাধিত হয়েছে।
তবুও যেহেতু এসব জনগোষ্ঠীর এদেশে সুস্পষ্ট অস্তিত্বের ইতিহাস সম্পূর্ণভাবে অনুদঘাটিত ও অজানা এবং স্মরণাতীতকালের হাজার হাজার বছর আগে থেকে এদের পূর্বপুরুষরা এই নদীবিধৌত পলল সমভূমিতে এসে বসতি স্থাপন করেছে সেহেতু স্বাভাবিকভাবেই একমাত্র তাদেরকে অর্থাৎ বাঙালিরাই Son of the Soil বা আদিবাসী বলা যায়। বিশ্বের তাবৎ শীর্ষস্থানীয় নৃবিজ্ঞানী এবং গবেষকবৃন্দই এ ব্যাপারে একমত।
পাহাড়ি অবাঙালি জাতিগোষ্ঠীগুলো আদিবাসী নয়:
বাংলাদেশের উপজাতীয় ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীগুলো এদেশের আদিবাসী বা ভূমিপুত্র নয়। তার প্রমাণ প্রখ্যাত উপজাতি গবেষক ও নৃতত্ত্ববিদ RHS Huchinson (1906) T H Lewin (1869), অমেরেন্দ্র লাল খিসা (১৯৯৬), J. Jaffa (1989) এবং N Ahmed (1959) প্রমুখের লেখা, গবেষণাপত্র, থিসিস এবং রিপোর্ট বিশ্লেষণে পাওয়া যায়। তারা সবাই একবাক্যে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজাতীয়দের নিকট অতীতের কয়েক দশক থেকে নিয়ে মাত্র কয়েক শতাব্দী আগে এদেশে স্থানান্তরিত হয়ে অভিবাসিত হবার যুক্তি-প্রমাণ ও ইতিহাস তুলে ধরেছেন।
খোদ চাকমা পণ্ডিত অমেরেন্দ্র লাল খিসা অরিজিনস অব চাকমা পিপলস অব হিলট্রেক্ট চিটাগংএ লিখেছেন, ‘তারা এসেছেন মংখেমারের আখড়া থেকে পরবর্তীতে আরাকান এলাকায় এবং মগ কর্তৃক তাড়িত হয়ে বান্দরবানে অনুপ্রবেশ করেন। আজ থেকে আড়াইশ তিনশ; বছর পূর্বে তারা ছড়িয়ে পড়ে উত্তর দিকে রাঙামাটি এলাকায়।’ এর প্রমাণ ১৯৬৬ বাংলাদেশ জিওগ্রাফিক্যাল সোসাইটি প্রকাশিত দি অরিয়েন্টাল জিওগ্রাফার জার্নাল।
পার্বত্য চট্টগ্রামের বর্তমান লোকসংখ্যার প্রায় অর্ধেকই বাঙালি এবং বাকি অর্ধেক বিভিন্ন মঙ্গোলীয় গোষ্ঠীভুক্ত উপজাতীয় শ্রেণীভুক্ত।
একথা ঐতিহাসিক ভাবে সত্য আদিকাল থেকে এ অঞ্চলে উপজাতি জনগোষ্ঠীর বাইরের ভূমিপুত্র বাঙালিরা বসবাস করে আসছে। তবে জনবসতি কম হওয়ায় বিভিন্ন ঘটনার বা পরিস্থিতির কারণে আশপাশের দেশ থেকে বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর লোকজন এসে বসতি স্থাপন করে। পার্বত্য চট্টগ্রামের কুকি জাতি বহির্ভূত অন্য সকল উপজাতীয় গোষ্ঠীই এখানে তুলনামূলকভাবে নতুন বসতি স্থাপনকারী।
এখানকার আদিম জনগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে ম্রো, খ্যাং, পাংখো এবং কুকিরা মূল ‘কুকি’ উপজাতির ধারাভুক্ত।
ধারণা করা হয়, এরা প্রায় ২শ’ থেকে ৫শ’ বছর আগে এখানে স্থানান্তরিত হয়ে আগমন করে। চাকমারা আজ থেকে মাত্র দেড়শ’ থেকে ৩শ’ বছর পূর্বে মোগল শাসনামলের শেষ থেকে ব্রিটিশ শাসনামলের প্রথম দিকে মায়ানমার আরকান অঞ্চল থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রবেশ করে (Lewin 1869)।
প্রখ্যাত নৃতত্ত্ববিদ এবং ব্রিটিশ প্রশাসক টি. এইচ. লেউইন-এর মতে, “A greater portion of the hill tribes at present living in the Chittagong Hill Tracts undoubtedly come about two generations ago from Aracan. This is asserted both by their own traditions and by records in Chittagong Collectorate”. (Lewin, 1869, p. 28)। পার্বত্য অঞ্চলের মারমা বা মগ জনগোষ্ঠী ১৭৮৪ সনে এ অঞ্চলে দলে দলে অনুপ্রবেশ করে এবং আধিপত্য বিস্তার করে (Shelley, 1992 and Lewin, 1869)। এরা ধর্মে বৌদ্ধ মতাবলম্বী। এরা তিনটি ধারায় বিভক্ত। যেমন : জুমিয়া, রোয়াং ও রাজবংশী মারমা।
ব্যোমরা মায়ানমার-চীন পর্বত থেকে নিয়ে তাশন পর্যন্ত বিস্তৃত পার্বত্য অঞ্চল থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে আগমন করে। খ্রিস্টান মিশনারি তৎপরতার ফলে এদের অধিকাংশই বর্তমানে ধর্মান্তরিত খ্রিস্টান। লুসাইরাও এখন অধিকাংশই খ্রিস্টান। পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্য একটি বড় জনগোষ্ঠী মুরং। এদের বেশির ভাগই এখন পর্যন্ত প্রকৃতি পূজারী এবং এদের কোনো ধর্মগ্রন্থও নেই (Bernot, 1960)
চাকমারা এখন বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী হলেও ভাষার দিক দিয়ে তারা ত্রিপুরা, মারমা বা অন্য যে কোনো পার্বত্য জনগোষ্ঠী থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। এদের ভাষা এখন অনেকটা বাংলা ভাষার কাছাকাছি। মারমা (মগ)গণ আরাকানী বর্মীয় উপভাষায় কথা বলে এবং ত্রিপুরাগণ ত্রিপুরি তিব্বতিধর্মী উপভাষায় কথা বলে। বিভিন্ন খ্রিস্টান মিশনারি সংস্থা পার্বত্য চট্টগ্রামে তাদের ধর্মপ্রচারের জোর তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে।
উল্লেখ্য, বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রামের সীমান্ত-সংলগ্ন মিজোরাম, মণিপুর, নাগাল্যান্ড এবং ত্রিপুরার বেশিরভাগ উপজাতীয় জনগোষ্ঠী খ্রিস্ট ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়েছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, অদূর ভবিষ্যতে ঐ অঞ্চলে ঐসব বিচ্ছিন্ন ও বিভিন্ন জনগোষ্ঠীকে খ্রিস্টধর্মের ছত্রছায়ায় একত্রিত করে বঙ্গোপসাগরের উত্তরাংশে ভারত-বাংলাদেশের এই পার্বত্য ভূ-রাজনৈতিক দিক দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ উত্তর-পূর্বাংশের যুক্তরাষ্ট্রে ও পাশ্চাত্য শক্তি ইসরাইলের মতো একটি খ্রিস্টান রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা করতে পারে। (প্রফেসর ড. আবদুর রব, প্রফেসর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় )
সর্বোপরি :
এদেশে ক্ষুদ্র নৃ-জনগোষ্ঠী উপজাতীয় জাতিসত্তাগুলো আমাদেরই অংশ, বাংলাদেশের নাগরিক, বাংলাদেশী। এদেশের সম্পদে-সম্মানে, বিপদে-সুদিনে, সমৃদ্ধিতে-সৌহার্দ্যে সবকিছুতেই তাদের রয়েছে সমান অধিকার।
কিন্তু তারা কোনোক্রমেই এদেশের আদিবাসী হতে পারে না। এটা নিতান্ত অবৈজ্ঞানিক ও ভুল তত্ত্ব। প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতেও মাত্র এসব জাতিতাত্ত্বিক বিভাজন বিচ্ছিন্নতাবাদ উস্কে দেয়ার জন্য অনেকগুলো খ্রিস্টবাদী এনজিও চক্রকে ঘাড় ধরে বের করে দিয়েছে ভারতীয় সরকার। বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরির জন্য এই বিতর্কগুলো সৃষ্টি করা হয়।
©
এই লেখাটি সোনার বাংলা ব্লগের একটি সাক্ষাৎকার থেকে সংকলিত।